নিউজিল্যান্ডের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে অনন্য এক রেকর্ড গড়লেন আজাজ প্যাটেল

জিম লেকার ও অনিল কুম্বলের পর যে ক্রিকেট রেকর্ড গড়লেন আজাজ ইউনুস প্যাটেল, তা রেকর্ড বইতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু যার উল্লেখ থাকবে না,

হয়তো কালের গর্ভে তলিয়া যাবে, তা আরো এক রেকর্ড- আজাজ প্রথম মুসলমান ক্রিকেটার, যিনি নিউ জিল্যান্ডের জাতীয় দলে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পান।

ক্রীড়ামঞ্চে ধর্মপরিচয়ের অবতারণায় ভ্রুকুঞ্চিত হতে পারে, তবে প্রশ্নটি অনভিপ্রেত নয়। দক্ষিণ গোলার্ধের দ্বীপরাষ্ট্রটি সাংস্কৃতিক বহুত্বের যে আকাঙ্ক্ষা সগর্বে উচ্চারণ করে থাকে, আজাজের কৃতিত্ব তার সুন্দর বিজ্ঞাপন, পাথুরে প্রমাণও বটে।

১৯৭০-এর দশক হতে ক্রমশ অভিবাসনবান্ধব নীতি প্রণয়ন করেছে নিউ জিল্যান্ড, বিশেষত এশীয়দের আহ্বান জানিয়েছে শ্বেতাঙ্গপ্রধান এই দেশ। স্মরণে থাকবে, দ্বীপরাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা মাওরি-রাও একদা পলিনেশিয়ার অপরাপর দ্বীপ হতে এসেছিল;

অতঃপর ইউরোপের নানা দেশ থেকে অভিবাসীদের আগমন। আজাজও আট বছর বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে ছিল। যে রঙিন স্বপ্ন লইয়া বিভুঁইয়ে এসেছিল এই পরিবার, আজাজের হাতে তা সফল হলো।

চলবার পথ যদিও মসৃণ ছিল না। ক্রিকেটেও নয়, সমাজেও নয়। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় বিফলতার পরে ১৯ বছর বয়স্ক আজাজ বুঝেছিলেন, ফাস্ট বোলিং তার ক্ষেত্র নয়। অতঃপর স্পিন বোলিংয়ের প্রচেষ্টা।

প্রায় এক যুগ ঘাম ঝরিয়ে ৩০ বছর বয়সে জাতীয় দলে ঢোকার সুযোগ, এবং অভিষেকেই বাজিমাত। ইতিহাসের সাথে ক্রমাগত মোলাকাত হচ্ছে এই ক্রিকেটারের।

প্রথম সিরিজের দুটি টেস্টে এক-এক ইনিংসে পাঁচটি করে উইকেট নিয়ে ৪৯ বছর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশকে অ্যাওয়ে সিরিজ উপহার দেন আজাজ। এর পর ভারতের মাটিতে ১০ উইকেট।

অনেক বছর আগে উন্নততর জীবনের লক্ষ্যে পরিবারের সাথে যে শহর ত্যাগ করে ছিলেন আজাজ প্যাটেল, সেই শহরের মাঠই তাকে বিশ্ববন্দিত নায়ক বানাল- এই ঘটনায় যে রোমাঞ্চ আছে, তা বস্তুত আজাজ প্যাটেলের জীবনসংগ্রামের খণ্ডমাত্র।

শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত বিশ্বে আজাজের ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ কথা নয়, ৯/১১ পরবর্তী পৃথিবীতে তো আরো নয়। ২০১৯ সালে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে ভয়াবহ নিধনযজ্ঞের কথা এখনো নাগরিকদের মনে স্পষ্ট।

আজাজও একসময় ধর্মপরিচয় লইয়া সবিশেষ আগ্রহী না হইলেও গত দুই বছরে নিজের পরিচিতি সম্পর্কে ক্রমশ সচেতন হয়েছেন, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের ইসলাম-বিদ্বেষের পরিপ্রেক্ষিতে তা জোরালোভাবে প্রকাশ করেছেন।

মুসলমান রাগবি খেলোয়াড় সোনি বিল উইলিয়ামস যখন নিউ জিল্যান্ডে বসবাসকারী ৫০ হাজার মুসলমানের পরিচয়-তালিকা নির্মাণে উদ্যোগী হন, তখন তার প্রচারেও ছিলেন আজাজ। বস্তুত, সংগ্রামের সময় আজাজ যা ভাবেননি, সাফল্যের চূড়ায় বসে তা অনুধাবন করেছেন।

বিশেষ পরিচিতির ছাপ গায়ে নিয়ে তার দেশে উন্নতি করা কতখানি কঠিন, শীর্ষে আরোহণ করে তা বুঝেছেন এই ক্রিকেটার। স্বপ্ন অর্জন করেই তা সন্ধানের পথটি চিনেছেন ও চেনাচ্ছেন আজাজ প্যাটেল।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *